Saturday, November 15, 2014

সাক্ষ্য দিতে আজ ভারত যাচ্ছেন ফেলানীর পিতা


ভারতের কুচবিহারে বিএসএফ সেক্টর সদর দপ্তরে স্থাপিত জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্স কোর্টে পুনরায় সাক্ষ্য দিতে ফেলানীর বাবা নূরুল ইসলাম নুরু কুড়িগ্রামে পৌঁছেছেন। নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ইউনিয়নের কলোনিটারী গ্রাম থেকে শনিবার বিকালে ৩৫ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে কুড়িগ্রাম বিজিবি ক্যাম্পে অবস্থান করছেন। ন্যায় বিচারের আশায় ৩ সদস্যের বাংলাদেশের টিম রোববার (আজ) সকাল ১১টায় ভারতের উদ্দেশে কুড়িগ্রাম ত্যাগ করবেন। কুড়িগ্রাম পৌঁছে নুরুল ইসলাম নুরু জানান, বিচার নিয়ে যেন আবারো তামাশা করা না হয়। এবার সুষ্ঠু বিচারের আশা নিয়ে তিনি ভারতে যাচ্ছেন। সোমবার ওই আদালতে তিনি সাক্ষ্য দিবেন। খুলে বলবেন সেদিন যা ঘটেছিল। কাছ থেকে গুলি করে মেরেছে বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষ। একটাই চাওয়া ফেলানীর খুনি বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষের ফাঁসি। কুড়িগ্রাম বিজিবি’র ৪৫ ব্যাটালিয়নের ভারপ্রাপ্ত কমান্ডিং অফিসার মেজর এটিএম হেমায়েতুল ইসলাম জানান, বিএসএফের ১৮১ ব্যাটালিয়নের পক্ষ থেকে কমান্ড্যান্ট ভিপি বাদলা শুক্রবার দুপুরে এক ফ্যাক্স বার্তায় বিচারকাজে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য ফেলানীর বাবা নুরুল ইসলাম নুরু, বিজিবি’র পরিচালক ও সরকার পক্ষের আইনজীবীকে সোমবার ভারতের কুচবিহারে বিএসএফ সেক্টর সদর দপ্তরে স্থাপিত জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্স কোর্টে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে। এ জন্য রোববার তারা কুড়িগ্রাম থেকে ভারতের উদ্দেশে রওনা হবেন। এর আগে ফেলানী হত্যা মামলার পুনর্বিচার কার্যক্রম শুরু হয় ২২শে সেপ্টেম্বর। আদালতে সাক্ষ্য দেয়ার আমন্ত্রণ পেয়ে ২৬শে সেপ্টেম্বর কুড়িগ্রামের ৪৫ বিজিবি’র সদর দপ্তর থেকে ভারতের পথে রওনা হন ফেলানীর বাবা নুরুল ইসলাম নুরু, বিজিবি’র ৪৫ ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল মোফাজ্জাল হোসেন আকন্দ ও কুড়িগ্রামের পাবলিক প্রসিকিউটর এডভোকেট আব্রাহাম লিংকন। কিন্তু ২৫ কিলোমিটার দূরে লালমনিরহাট জেলার বড়বাড়ি নামক স্থানে পৌঁছানোর পর মোবাইলে জানানো হয় আদালত ৩ দিনের জন্য মুলতবি হয়ে গেছে। পরবর্তীতে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য সময় ও তারিখ জানানো হবে। ফলে মাঝপথ থেকেই ফেরত আসেন তিন সদস্যের ঐ টিম। অবশেষে আবারো ডাক পড়লো ভারতের আদালতে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য। পাবলিক প্রসিকিউটর এডভোকেট এস.এম আব্রাহাম লিংকন বলেন, ন্যায় বিচারের স্বার্থে ভারতের বিশেষ আদালতে সাক্ষীদের উপস্থিতি প্রয়োজন। ভারত সরকার পুনঃবিচার কার্যক্রম শুরু করেই স্বীকার করে নিয়েছে প্রথম দফায় অনুষ্ঠিত ফেলানী হত্যার রায় সঠিক হয়নি। সে রায়ে অবিচার সাধিত হয়েছিল। পুনঃবিচার শুরু হওয়ায় ফেলানীর পরিবার তথা বাংলাদেশ নাগরিকের হত্যার ন্যায় বিচার পাবার পথ প্রশস্ত হয়েছে। কারণ ইতিপূর্বে দেয়া তথ্যউপাত্ত এবং সাক্ষ্য সব কিছুই ন্যায় বিচার পাবার অনুকূলে। বিএসএফের হাবিলদার অমিয় ঘোষ আত্মস্বীকৃত খুনি। আদালতে তা স্বীকারও করেছিল এবং সাক্ষ্য প্রমাণেও প্রমাণিত নিরস্ত্র ফেলানীকে কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। কাজেই আমি আশাবাদী ন্যায় বিচার পাব। তিনি আরো বলেন, বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারায় (অনিচ্ছাকৃত খুন) এবং বিএসএফ আইনের ৪৬ ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়। এ ধারায় অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সর্বনিম্ন ৭ বছর কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। উল্লেখ্য, ২০১১ সালের ৭ই জানুয়ারি শুক্রবার ভোর সোয়া ৬টার দিকে দালালের মাধ্যমে মই বেয়ে কাঁটাতারের বেড়া পাড় হওয়ার সময় ভারতীয় বিএসএফের গুলি বিদ্ধ হয়ে আধাঘণ্টা ধরে ছটফট করে নির্মমভাবে মৃত্যু হয় কিশোরী ফেলানীর। ভারত থেকে কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ীর অনন্তপুর সীমান্ত দিয়ে বাবার সাথে বাড়ি ফেরার সময় এ নৃশংসতার শিকার হয় ফেলানী। এরপর সকাল পৌনে ৭টার থেকে নিথর দেহ কাঁটাতারের উপর ঝুলে থাকে দীর্ঘ সাড়ে ৪ ঘণ্টা। পরে বিএসএফ লাশ নামিয়ে ভারতের অভ্যন্তরে নিয়ে যায়। এরপর বিশ্বব্যাপী তোলপাড় শুরু হলে মৃত্যুর ৩০ ঘণ্টা পর ৮ই জানুয়ারি শনিবার লাশ ফেরত দেয় বিএসএফ। বাংলাদেশে আর এক দফা ময়নাতদন্ত শেষে লাশ দাফন হয় ৭৩ ঘণ্টা পর। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অব্যাহত চাপের মুখে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন কুড়িগ্রামে এসে ফেলানীর মা ও ভাইবোনদের ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেন। আর ১৫ই ফেব্রুয়ারি নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা এবং গোপনীয়তায় সারাদিন লুকোচুরি খেলা শেষে বিকালে মা ও ভাইবোনদের বাংলাদেশে ফেরত দেয় ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনাটি দেশ-বিদেশের গণমাধ্যম ও মানবাধিকার কর্মীদের কাছে ব্যাপকভাবে সমালোচনার ঝড় তোলে। খোদ ভারতের গণমাধ্যমগুলোর সোচ্চার ভূমিকায় কুচবিহারের বিএসএফ’র বিশেষ আদালতে ২০১৩ সালের ১৩ই আগস্ট বিচারিক কার্যক্রম শুরু করে ভারত সরকার। আদালতে সাক্ষী দেন প্রত্যক্ষদর্শী বাবা নুরুল ইসলাম নুরু ও মামা আব্দুল হানিফ। কিন্তু অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষকে ২০১৩ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর বেকসুর খালাস দেয় বিশেষ আদালত। এই রায় প্রত্যাখ্যান করে ফেলানী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি ও ক্ষতিপূরণ দাবি করে ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশনারের কাছে মানবাধিকার সংগঠন আসক (আইন ও সালিশ কেন্দ্র) এর মাধ্যমে আবেদন করেন ফেলানীর বাবা নুরুল ইসলাম নুরু। এরই পরিপ্রেক্ষিতে মামলাটি পুনর্বিচারের সিদ্ধান্ত নেয় বিএসএফ কর্তৃপক্ষ। চলতি বছর ২২শে সেপ্টেম্বর পুনর্বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। কিছুদিন মুলতবি রাখার পর আবারো আদালতের কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে ১৭ই নভেম্বর সোমবার।

No comments:

Post a Comment